বিজ্ঞপ্তি
জরুরী ভিত্তিতে সারাদেশে সাংবাদিক নিয়োগ. দেশের জনপ্রিয়  voiceofchandpur.com অনলাইন নিউজ-এ জরুরী ভিত্তিতে বাংলাদেশের প্রতিটি থানায়. একজন থানা প্রতিনিধি ও প্রতি জেলায় একজন জেলা প্রতিনিধি  নিয়োগ দেওয়া হবে। 
হারানো গৌরব ফিরেছে মাছে

হারানো গৌরব ফিরেছে মাছে

দেশে দৈনন্দিন খাদ্যে প্রাণিজ আমিষের প্রায় ৬০ শতাংশ জোগান দেয় মৎস্য খাত। জাতীয় অর্থনীতিতে মৎস্য খাতের অবদান জিডিপিতে ৩.৫০ শতাংশ এবং কৃষি খাতের অবদান ২৫.৭১ শতাংশ। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ৬৮ হাজার ৯৩৫ টন মাছ ও মৎস্যজাত দ্রব্য রপ্তানি করে বাংলাদেশ আয় করে চার হাজার ৩০৯ কোটি ৯৪ লাখ টাকা। এ রপ্তানি আয়ের বড় অংশই এসেছে চিংড়ি থেকে

মাছে-ভাতে বাঙালি—কথাটি এমনি এমনি আসেনি। এমন বাঙালিও আছেন, যিনি কিনা খেতে বসে মাছ রান্না হয়নি জেনে উঠে গিয়ে বাড়ির পুকুর কিংবা পাশের জলাশয় থেকে ছিপ অথবা জাল দিয়ে মাছ ধরে কেটে-ধুয়ে ভেজে নিয়ে তবে ভাত খাওয়া শুরু করেন! আজকাল নানা ভিনদেশি খাবারে রসনাবিলাসের প্রচলন হলেও বাঙালি খাবারের অন্যতম অনুষঙ্গ মাছ। আর সেটা যদি ইলিশ হয়, তাহলে তো কথাই নেই।

ইলিশ পছন্দ করে না এমন বাঙালি খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। ইলিশ স্বাদে ও গুণে সত্যিই অতুলনীয়। সরষে ইলিশ দেখলেই বাঙালির জিহ্বায় পানি চলে আসে। ইলিশ পোলাও, ইলিশ দোপিয়াজা, ইলিশ পাতুরি, ইলিশ ভাজা, ভাপা ইলিশ, স্মোকড ইলিশ, ইলিশের মালাইকারি—এমন নানা পদের খাবার বাংলাদেশের সব বাঙালির কাছে খুবই প্রিয়। এখন শুধু দেশে নয়, বিদেশেও জনপ্রিয়তা বাড়ছে ইলিশের।

মাঝে বেশ কয়েক বছর দেশের ইলিশ প্রায় হারিয়ে যেতে বসেছিল। তবে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকার ইলিশসহ বিভিন্ন প্রজাতির দেশি মাছ রক্ষা ও উৎপাদন বৃদ্ধিতে বেশ কিছু উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে, যেগুলোর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে বছরের একটি নির্দিষ্ট সময়ে মা ইলিশ শিকারের ওপর নিষেধাজ্ঞা। এ ছাড়া মাছের উৎপাদন বৃদ্ধিতে নানামুখী পদক্ষেপের কারণে ইলিশের প্রজনন ও উৎপাদন উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। ‘মাছে-ভাতে বাঙালি’ যেন তার ঐতিহ্য ফিরে পেয়েছে। সম্প্রতি মাছের বাজারেও দেখা মেলে বেশ বড় সাইজের রুপালি ইলিশ। স্বাদ ও সাধ্য মিলিয়ে কেনা যায় পছন্দের ইলিশ। শুধু ইলিশ নয়, অন্যান্য মাছের উৎপাদনও বেড়েছে। মাছ উৎপাদনে বাংলাদেশ বিশ্বের মধ্যে চতুর্থ অবস্থানে রয়েছে।

জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা মাছ নিয়ে তাদের ‘দ্য স্টেট অব ওয়ার্ল্ড ফিশারিজ অ্যান্ড অ্যাকুয়াকালচার ২০২০’ শিরোনামে প্রকাশিত বৈশ্বিক প্রতিবেদনে বলেছে, স্বাদু পানির উন্মুক্ত জলাশয় থেকে মাছ আহরণে বাংলাদেশের অবস্থান বিশ্বে তৃতীয়। ২০১৮ সালে আহরিত মাছের পরিমাণ ছিল ১.২২ মিলিয়ন টন। আর চাষ করা মাছ উৎপাদনে বিশ্বে পঞ্চম স্থানে রয়েছে বাংলাদেশ। এই উৎস থেকে ২০১৮ সালে উৎপাদিত মাছের পরিমাণ ২৪ লাখ পাঁচ হাজার ৪০০ টন। ২০১৭ সাল থেকে এই অবস্থান ধরে রেখেছে বাংলাদেশ। বাংলাদেশ মাছ উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করেছে বলে ২০১৮ সালে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেন তখনকার মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী নারায়ণ চন্দ্র চন্দ।

সম্প্রতি দেশের পুকুর ও খালে মাছ চাষে নীরব বিপ্লব ঘটেছে। বাংলাদেশে মাছের উৎপাদন বেড়েছে ২৫ গুণ। গত তিন দশকে মাছের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের এই অর্জন। দেশে উৎপাদিত মাছের ৭৫ শতাংশ এখন বাণিজ্যিকভাবে বাজারজাত করছেন মৎস্য চাষিরা। ইন্টারন্যাশনাল ফুড পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (আইএফপিআরআই) সর্বশেষ সমীক্ষায় এ তথ্য জানানো হয়েছে। আইএফপিআরআইয়ের সমীক্ষায় বলা হয়েছে, বাড়তি চাহিদা, প্রযুক্তির উন্নয়ন, যোগাযোগ অবকাঠামো, লাখ লাখ পুকুর মালিক এবং ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের বিনিয়োগে বাংলাদেশে মাছের উৎপাদন দ্রুতগতিতে বেড়েছে। পারিবারিক প্রয়োজনে মাছ চাষের ধারণা এখন বদলে গেছে। ভোক্তাদের এখন নিজের পুকুরের মাছ খাওয়ার পাশাপাশি বাজার থেকে কেনার প্রবণতাও বেড়েছে।

মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, পাঁচ বছর ধরে ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে মাছের উৎপাদন। ২০১৪-১৫ অর্থবছরে দেশে মাছ উৎপাদিত হয় ৩৬ লাখ ৮৪ হাজার টন, ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ৩৮ লাখ ৭৮ হাজার টন, ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ৪১ লাখ ৩৪ হাজার টন, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ৪২ লাখ ৭৭ হাজার টন এবং ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ৪৩ লাখ ৮১ হাজার টন।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, এই সাফল্যের পেছনে রয়েছে মূলত ইলিশের উৎপাদন বৃদ্ধি। দেশের অভ্যন্তরীণ জলাশয়গুলোতে গত এক যুগে ইলিশের উৎপাদন বেড়েছে দ্বিগুণের বেশি। এর একটাই কারণ, ইলিশ আহরণে নিয়ম-শৃঙ্খলা মেনে চলার প্রবণতা আগের তুলনায় বেড়েছে। প্রজনন ঋতুতে ইলিশ ধরার নিষেধাজ্ঞা আগের তুলনায় বেশি কার্যকর হচ্ছে। এ ব্যাপারে জেলেদের সচেতনতা বেড়েছে, সরকারি প্রশাসনের নজরদারিও আগের তুলনায় উন্নত হয়েছে। এরপর রয়েছে পুকুর ও ছোট জলাশয়ে মাছ চাষের ক্ষেত্রে বৈপ্লবিক অগ্রগতি। এ ক্ষেত্রে দেশের মৎস্যবিজ্ঞানীদের বিশেষ অবদান রয়েছে। তাঁরা বিভিন্ন প্রজাতির দেশি মাছের উন্নত জাত উদ্ভাবন করেছেন, যেগুলো চাষিরা পুকুর ও ছোট জলাশয়ে পরিকল্পিতভাবে উৎপাদন করে লাভবান হচ্ছেন। বিজ্ঞানীরা অনেক বিলুপ্তপ্রায় প্রজাতির দেশি মাছের আধুনিক চাষ পদ্ধতি উদ্ভাবন করতে সক্ষম হয়েছেন। চাষিরা সেগুলো উৎপাদন করে লাভবান হচ্ছেন এবং মাছগুলো বিলুপ্তির হাত থেকে রক্ষা পাচ্ছে।

দেশে দৈনন্দিন খাদ্যে প্রাণিজ আমিষের প্রায় ৬০ শতাংশ জোগান দেয় মৎস্য খাত। জাতীয় অর্থনীতিতে মৎস্য খাতের অবদান জিডিপিতে ৩.৫০ শতাংশ এবং কৃষি খাতে অবদান ২৫.৭১ শতাংশ। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ৬৮ হাজার ৯৩৫ টন মাছ ও মৎস্যজাত দ্রব্য রপ্তানি করে বাংলাদেশ আয় করেছে চার হাজার ৩০৯ কোটি ৯৪ লাখ টাকা। এ রপ্তানি আয়ের বড় অংশই এসেছে চিংড়ি থেকে। দেশের রপ্তানি আয়ের ৪ শতাংশের বেশি আসে মৎস্য খাত থেকে। পাঙ্গাশ, তেলাপিয়াসহ অন্য মাছ বিদেশে রপ্তানি শুরু হলে আয় কয়েক গুণ বাড়বে বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা দাবি করছেন।

মৎস্য খাতে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির ব্যাপক সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে বলে মনে করেন বর্তমান মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী শ ম রেজাউল করিম। তিনি বলেছেন, মাছ উৎপাদনে বাংলাদেশ রেকর্ড সৃষ্টি করেছে। বাংলাদেশ এখন মাছে স্বয়ংসম্পূর্ণ। বাংলাদেশ বিশ্বে মাছ উৎপাদনে চতুর্থ অবস্থানে রয়েছে। গবেষণার মাধ্যমে হারিয়ে যাওয়া অনেক প্রজাতির মাছ এখন চাষ করা হচ্ছে। সরকারি-বেসরকারিভাবেও হারিয়ে যাওয়া মাছ চাষ হচ্ছে। মাছ চাষে আরো গবেষণা হবে। এ ছাড়া মা ইলিশ ও জাটকা রক্ষায় সরকার ব্যাপক কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। ইলিশ ধরা বন্ধের সময় জেলেদের নানা ধরনের সহায়তাও দেওয়া হচ্ছে। সরকারের নানামুখী কর্মকাণ্ড ও বেকারত্ব নিরসনে মৎস্য খাত বড় ধরনের ভূমিকা রাখবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, সাধারণ পুকুর, জলাশয়, নদী, খাল-বিলের পাশাপাশি সমুদ্রের মৎস্যসম্পদের বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে। বঙ্গবন্ধুকন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রচেষ্টায় পাশের দেশ ভারতের সঙ্গে সমুদ্র সীমানা বিরোধ নিষ্পত্তি হয়েছে। ফলে মৎস্যসম্পদের এক বিশাল ভাণ্ডারের দ্বার উন্মোচিত হয়েছে। গভীর সমুদ্র থেকে পর্যাপ্ত পরিমাণ মৎস্যসম্পদ আহরণের লক্ষ্যে এরই মধ্যে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারে দেশি-বিদেশি সহযোগিতা গ্রহণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। গভীর সমুদ্র থেকে মৎস্যসম্পদ আহরণের জন্য আধুনিক প্রযুক্তি আমদানি, জেলেদের প্রশিক্ষণ, মাছ সংরক্ষণ, দেশে বাজারজাতকরণের পাশাপাশি বিদেশে রপ্তানির জন্য সরকারিভাবে পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। পরিকল্পিতভাবে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে মৎস্য আহরণ ও উৎপাদনের মাধ্যমে দেশে আমিষের চাহিদা পূরণের পাশাপাশি মৎস্য খাত থেকে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন সম্ভব হবে।

খবরটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *




© All rights reserved © 2018 voiceofchandpur.com
Desing & Developed BY DHAKATECH.NET