বিজ্ঞপ্তি
জরুরী ভিত্তিতে সারাদেশে সাংবাদিক নিয়োগ. দেশের জনপ্রিয়  voiceofchandpur.com অনলাইন নিউজ-এ জরুরী ভিত্তিতে বাংলাদেশের প্রতিটি থানায়. একজন থানা প্রতিনিধি ও প্রতি জেলায় একজন জেলা প্রতিনিধি  নিয়োগ দেওয়া হবে। 
ভোরে পদ্মায় লাশের সারি

ভোরে পদ্মায় লাশের সারি

ভোরের আলো ফুটতে শুরু করেছে কেবল। মুন্সীগঞ্জের লৌহজংয়ের শিমুলিয়া ঘাট থেকে সকাল ৬টার দিকে ৩১ যাত্রী নিয়ে স্পিডবোটে গাদাগাদি করে যাত্রা। গন্তব্য মাদারীপুরের শিবচর উপজেলার বাংলাবাজার ঘাট। পথিমধ্যে কাঁঠালবাড়ী (পুরনো ফেরিঘাট) ঘাটের কাছে আসতেই নদীর পারে নোঙর করা একটি বাল্কহেডের (বালু টানা কার্গো) পেছনে সজোরে ধাক্কা লেগে দুমড়েমুচড়ে যায় স্পিডবোটটি। পদ্মার জলে ছিটকে পড়ে ৩১ যাত্রীর সবাই। ভাগ্যক্রমে সাঁতরে তীরে ফেরে পাঁচজন। অন্য ২৬ জন নিজেদের বাঁচাতে পারেনি। চলে গেছে না-ফেরার দেশে। নিহতদের সবার মাথায় গুরুতর জখম ছিল। ধারণা করা হচ্ছে, অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে তাঁদের মৃত্যু হয়েছে। তবে কারোর শরীরে লাইফ জ্যাকেট ছিল না।

এ ঘটনায় মাদারীপুর জেলা প্রশাসনের স্থানীয় সরকার বিভাগের উপপরিচালক আজহারুল ইসলামকে প্রধান করে ছয় সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটিকে আগামী তিন দিনের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে। গতকাল সোমবার রাতে এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত ২৫ জনের পরিচয় শনাক্ত শেষে লাশ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাত্ক্ষণিক প্রত্যেক নিহতের পরিবারকে ২০ হাজার টাকা করে দেওয়া হয়েছে। দুর্ঘটনায় আহত পাঁচজনকে ভর্তি করা হয়েছে হাসপাতালে। কান্দু মোল্লা ও জহিরুল ইসলামের মালিকানাধীন বড় আকারের স্পিডবোটটি চালাচ্ছিলেন শাহ আলম। এদিকে বিকেলে স্পিডবোটের চালক শাহ আলমকে আটক করে পুলিশ।

একাধিক সূত্রে জানা যায়, দুর্ঘটনার পরই যাত্রীরা ছিটকে বাল্কহেডের স্টিলে ধাক্কা খেয়ে মারাত্মকভাবে আহত হয়। এতে বেশির ভাগ যাত্রী মাথা ও শরীরের বিভিন্ন অংশে আঘাত পেয়ে চেতনা হারিয়ে পদ্মায় ডুবে যায়। কয়েকজন যাত্রী আঘাত পেয়েও ভেসে থাকে। তারাই কোনো রকমে তীরে ফেরে। খবর পেয়ে নৌ পুলিশের একটি দল ঘটনাস্থলে গিয়ে উদ্ধার অভিযান শুরু করে। পরে সেনা সদস্য, পুলিশ, ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা উদ্ধার অভিযানে অংশ নেন। দুপুরের মধ্যেই উদ্ধারকর্মীরা শিশুসহ ২৬ জনের লাশ উদ্ধার করে। লাশগুলো শিবচরের কাঁঠালবাড়ীর দোতারা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠে রাখা হয়। দুপুরেই নিহতদের স্বজনরা লাশ শনাক্তে বিদ্যালয় মাঠে আসতে শুরু করে। এ সময় নিহতদের স্বজনদের আহাজারিতে আকাশ-বাতাস ভারী হয়ে ওঠে। খবর পেয়ে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের মহাপরিচালক কমোডর জালালউদ্দিন আহমেদ, বিআইডাব্লিউটিএর পরিচালক মো. রফিকুল ইসলাম, মাদারীপুরের জেলা প্রশাসক ড. রহিমা খাতুন, পুলিশ সুপার গোলাম মোস্তফা রাসেল, উপজেলা চেয়ারম্যান আবদুল লতিফ মোল্লা, শিবচর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আসাদুজ্জামানসহ প্রশাসনের কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলে ছুটে যান।

যাঁরা মারা গেছেন তাঁরা হলেন খুলনার তেরখাদার বারুখালীর মনির মিয়া (৩৮), হেনা বেগম (৩৬), সুমী আক্তার (৫) ও রুমি আক্তার (৩), ফরিদপুরের আলফাডাঙ্গার চরডাঙ্গা গ্রামের আরজু শেখ (৫০) ও ইয়ামিন সরদার (২), মুন্সীগঞ্জ সদর উপজেলার সাগর ব্যাপারী (৪০), কুমিল্লার দাউদকান্দির কাউসার আহম্মেদ (৪০) ও রুহুল আমিন (৩৫), কুমিল্লার তিতাসের জিয়াউর রহমান (৩৫), মাদারীপুরের রাজৈরের তাহের মীর (৪২), মাদারীপুরের শিবচরের হালান মোল্লা (৩৮) ও শাহাদাত হোসেন মোল্লা (২৯), বরিশালের তেদুরিয়ার আনোয়ার চৌকিদার (৫০), মাদারীপুরের রায়েরকান্দির মাওলানা আব্দুল আহাদ (৩০), চাঁদপুরের উত্তর মতলবের মো. দেলোয়ার হোসেন (৪৫), নড়াইলের লোহাগড়া উপজেলার রাজাপুরের জুবায়ের মোল্লা (৩৫), মুন্সীগঞ্জ সদরের সাগর শেখ (৪১), বরিশালের মেহেন্দীগঞ্জের সায়দুল হোসেন (২৭) ও রিয়াজ হোসেন (৩৩), ঢাকার পীরেরবাগের খোরশেদ আলম (৪৫), ঝালকাঠির নলছিটির এস এম নাসির উদ্দীন (৪৫), বরিশালের মেহেন্দীগঞ্জের মো. সাইফুল ইসলাম (৩৫), পিরোজপুরের চরখামারের মো. বাপ্পি (২৮) ও পিরোজপুরের ভাণ্ডারিয়ার জনি অধিকারী (২৬)। অপর নিহত যাত্রী বরিশালের মেহেন্দীগঞ্জের মনির হোসেন জমাদ্দারের (৩৫) নাম নিশ্চিত হলেও পরিচয় শনাক্ত করা যায়নি।

ফায়ার সার্ভিসের মাদারীপুর ইউনিটপ্রধান নজরুল ইসলাম বলেন, ‘খবর পেয়ে আমরা ঘটনাস্থলে পৌঁছে উদ্ধার তৎপরতা শুরু করি। ২৬টি লাশ উদ্ধার করা হয়েছে।’

শিবচর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আসাদুজ্জামান বলেন, নিহত কারোর পরনে লাইফ জ্যাকেট ছিল না। সবার মাথায় ছিল আঘাতের চিহ্ন।

মাদারীপুরের জেলা প্রশাসক ড. রহিমা খাতুন বলেন, নিহতদের দাফনের জন্য পরিবারপ্রতি ২০ হাজার টাকা করে অনুদান দেওয়া হয়েছে। দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে ছয় সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটিকে আগামী তিন দিনের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদন পেয়ে দোষীদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

ক্ষতিপূরণ দাবি : কাঁঠালবাড়ীতে স্পিডবোট দুর্ঘটনায় দায়ীদের শাস্তি এবং প্রত্যেক নিহতের পরিবারকে ১০ লাখ টাকা করে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি। গতকাল এক বিবৃতিতে সংগঠনের মহাসচিব মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী এই দাবি জানান। তিনি বলেন, লকডাউনের মধ্যেও এত বেশিসংখ্যক যাত্রী নিয়ে স্পিডবোট চলাচলের জন্য ঘাট ইজারাদার, নৌ পুলিশ, কোস্ট গার্ড, বিআইডাব্লিউটিএ ও সমুদ্র পরিবহন অধিদপ্তর কেউ দায় এড়াতে পারে না।

খবরটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *




© All rights reserved © 2018 voiceofchandpur.com
Desing & Developed BY DHAKATECH.NET