কুমিল্লার লালমাইয়ে ধানক্ষেত থেকে সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী জান্নাতুল তাজমিনের (১৪) মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় রহস্যের সৃষ্টি হয়েছে। মৃত্যুর আগের রাতে বাবার মুঠোফোনে নিজের লাইভ লোকেশন পাঠিয়ে তাঁকে নিয়ে যাওয়ার অনুরোধ করেছিল তাজমিন। কিন্তু এরপর কী ঘটেছিল, কীভাবে সে নির্জন ধানক্ষেতে পৌঁছাল এবং কারা তার মৃত্যুর জন্য দায়ী, তা এখনো জানা যায়নি। ঘটনাস্থলের কাছ থেকে উদ্ধার হওয়া সিএনজিচালিত অটোরিকশাসহ বিভিন্ন আলামতের সূত্র ধরে তদন্ত করছে পুলিশ।
গত বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) সকালে লালমাই উপজেলার জগতপুর গ্রামের একটি ধানক্ষেত থেকে তাজমিনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। তার গলায় গামছা প্যাঁচানো ছিল।
প্রাথমিকভাবে তাকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়ে থাকতে পারে বলে ধারণা করছে পুলিশ। ঘটনাস্থলের আশপাশে তল্লাশি চালিয়ে একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশাও জব্দ করা হয়েছে।
বাবাকে পাঠিয়েছিল লাইভ লোকেশন
নিহত জান্নাতুল তাজমিন যশোর সদর উপজেলার ছাতিয়ানতলা গ্রামের আবদুল আলীমের মেয়ে। সে কুমিল্লা নগরীর ফরিদা বিদ্যায়তনের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল। তার বাবা আবদুল আলীম রেনেটা ওষুধ কোম্পানির কুমিল্লা অঞ্চলে চাকরি করেন। পরিবারের সদস্যরা নগরীর রেসকোর্স এলাকার একটি ভাড়া বাসায় থাকতেন।
পরিবার সূত্রে জানা গেছে, চার দিন আগে বান্ধবীর বাসায় যাওয়ার কথা বলে বাড়ি থেকে বের হয়েছিল তাজমিন। পরে সে কক্সবাজারে গিয়েছিল বলে জানা যায়। সেখান থেকে ফেরার পথে কুমিল্লার পদুয়ার বাজার এলাকায় নেমেছিল সে।
ঘটনার আগের রাতে বাবার মুঠোফোনে নিজের লাইভ লোকেশন পাঠিয়ে তাকে নিয়ে যাওয়ার অনুরোধ করেছিল তাজমিন। তবে বাবাকে অবস্থান জানানোর পর তার সঙ্গে কী ঘটেছিল, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
কক্সবাজার থেকে ফেরার পর তাজমিন কীভাবে লালমাইয়ের জগতপুর এলাকায় পৌঁছাল, কার সঙ্গে সেখানে গিয়েছিল এবং কীভাবে তার মৃত্যু হলো—এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে পুলিশ।
ঘটনাস্থলে অটোরিকশা, ধানক্ষেতে ধস্তাধস্তির চিহ্ন
জগতপুর গ্রামের ভেতর দিয়ে যাওয়া নির্জন পাকা সড়কটির দুই পাশে বিস্তৃত ফসলি জমি। সড়কের কাছাকাছি কয়েকটি ধানক্ষেতে ধানগাছ এলোমেলো হয়ে পড়ে থাকতে দেখা গেছে। সেখানে ধস্তাধস্তি বা দৌড়াদৌড়ির ঘটনা ঘটে থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
সড়কের এক পাশে ধানক্ষেতে পড়ে ছিল একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশা। পরে স্থানীয় লোকজন সেটি টেনে সড়কের ওপর তুলে আনেন। পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে অটোরিকশাটি জব্দ করেছে। গাড়িটির নিবন্ধন রয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। সেটির সূত্র ধরে তদন্ত এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
হত্যা মামলা করেছেন বাবা
বৃহস্পতিবার সকালে তাজমিনের মরদেহ উদ্ধারের পর ময়নাতদন্তের জন্য কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়। ময়নাতদন্ত শেষে সন্ধ্যা সাতটার দিকে স্বজনেরা মরদেহ নিয়ে যশোরের উদ্দেশে রওনা হন। যশোর সদর উপজেলার ছাতিয়ানতলা এলাকায় পারিবারিক কবরস্থানে তাকে দাফন করার কথা জানিয়েছে পরিবার।
এ ঘটনায় তাজমিনের বাবা আবদুল আলীম বাদী হয়ে লালমাই থানায় অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করে হত্যা মামলা করেছেন।
কুমিল্লার সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার (সদর দক্ষিণ সার্কেল) মোস্তাইন বিল্লাহ বলেন, স্থানীয় লোকজনের কাছ থেকে খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে মরদেহ উদ্ধার করে। সেখান থেকে একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশাও জব্দ করা হয়েছে। নিহতের শরীরে দৃশ্যমান আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়নি। তবে তার গলায় গামছা প্যাঁচানো ছিল। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, শ্বাসরোধ করে তাকে হত্যা করা হয়েছে। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পাওয়ার পর মৃত্যুর প্রকৃত কারণ সম্পর্কে বিস্তারিত জানা যাবে।
মোস্তাইন বিল্লাহ আরও বলেন, জব্দ করা অটোরিকশাটির নিবন্ধন রয়েছে। গাড়িটির সূত্র ধরে তদন্ত এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদ্ঘাটনে পুলিশের একাধিক ইউনিট কাজ করছে।

নিজস্ব প্রতিবেদক