আসন্ন জাতীয় বাজেটকে শুধু আয়-ব্যয়ের হিসাব হিসেবে নয়, বরং বৈষম্য হ্রাস ও সাধারণ মানুষের উন্নয়নের নৈতিক দলিল হিসেবে প্রণয়নের আহ্বান জানিয়েছেন বক্তারা। তাদের মতে, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও কৃষি খাতকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব না দিলে টেকসই উন্নয়ন সম্ভব হবে না।
বুধবার জাতীয় প্রেসক্লাবে অনুষ্ঠিত “স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও কৃষি খাতে প্রাপ্তি ও প্রত্যাশা” শীর্ষক সেমিনারে এসব কথা বলা হয়।
সেমিনারে প্রধান অতিথি ছিলেন মোহাম্মদ মুসলিম চৌধুরী। প্রধান আলোচক হিসেবে বক্তব্য দেন ড. মাহবুব উল্লাহ। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ড. একেএম ওয়ারেসুল করিম।
এছাড়া আলোচনায় অংশ নেন নূরুন্নিসা সিদ্দিকা, ড. খ ম কবিরুল ইসলাম, ড. মো. ফরিদুল ইসলাম, মাসুমুর রহমান খলিলী এবং ডা. মোহাম্মদ রুহুল আমিন। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন ড. মোজাম্মেল হক এবং সঞ্চালনা করেন ড. খুরশীদ আলম।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে মোহাম্মদ মুসলিম চৌধুরী বলেন, মন্ত্রণালয়গুলোর মধ্যে সমন্বয়হীনতার কারণে বরাদ্দকৃত অর্থ অনেক সময় কার্যকরভাবে ব্যবহার করা যায় না। হাসপাতালের ভবন নির্মাণ হলেও প্রয়োজনীয় জনবল না থাকায় যন্ত্রপাতি অকেজো পড়ে থাকে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
তিনি আরও বলেন, বাজেটের আকার বাড়লেও কর আদায়ে প্রত্যাশিত অগ্রগতি হয়নি। প্রশাসনিক দুর্বলতা ও অদক্ষতার কারণে রাজস্ব আহরণে ঘাটতি রয়েছে। সরকারি বিভাগগুলোকে প্রযুক্তিনির্ভর ও দক্ষ করে তোলার পাশাপাশি প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাস এবং উপজেলা পর্যায়ে স্বতন্ত্র বাজেট ও পরিকল্পনার প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন তিনি।
প্রধান আলোচক ড. মাহবুব উল্লাহ বলেন, প্রচলিত ধারণায় বাজেট সরকারের আয়-ব্যয়ের হিসাব হলেও বাস্তবে তা অনেক সময় ধনিকগোষ্ঠীর কাছে সম্পদ স্থানান্তরের মাধ্যম হয়ে দাঁড়ায়। তাই বাজেটকে এমনভাবে প্রণয়ন করতে হবে, যাতে তা বৈষম্য না বাড়িয়ে সাধারণ মানুষের কল্যাণ নিশ্চিত করে।
তিনি বলেন, সীমিত কৃষিজমির দেশে কৃষিখাতে বিশেষ বরাদ্দ অব্যাহত রাখা জরুরি। পাশাপাশি কৃষিজমিতে অপরিকল্পিত আবাসন নির্মাণ বন্ধ করতে হবে। স্বাস্থ্যখাত প্রসঙ্গে তিনি শিশু অপুষ্টি রোধে কার্যকর উদ্যোগের ওপর গুরুত্বারোপ করেন এবং শিক্ষার মানোন্নয়নে যোগ্য শিক্ষক নিয়োগ ও মূল্যায়নের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন।
মূল প্রবন্ধে ড. একেএম ওয়ারেসুল করিম বলেন, দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা সরকারি, বেসরকারি, ইংরেজি মাধ্যম ও মাদরাসা ধারায় বিভক্ত হওয়ায় সমমানের দক্ষতা ও নাগরিক চেতনা গড়ে উঠছে না। চতুর্থ শিল্পবিপ্লব মোকাবিলায় STEM শিক্ষা, গবেষণা এবং সমালোচনামূলক চিন্তার বিকাশ জরুরি বলে মত দেন তিনি।
স্বাস্থ্যখাত প্রসঙ্গে তিনি বলেন, দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থা উচ্চমূল্যের বেসরকারি ও অতিরিক্ত চাপগ্রস্ত সরকারি সেবার মধ্যে বিভক্ত হয়ে পড়েছে। এতে চিকিৎসা ব্যয়ের চাপ বহু পরিবারকে আর্থিক সংকটে ফেলছে। সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা, ডিজিটাল স্বাস্থ্য ডেটাবেজ, টেলিমেডিসিন এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক রোগ নির্ণয় ব্যবস্থার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
কৃষিখাত নিয়ে তিনি বলেন, জলবায়ু পরিবর্তন, ঋণের চাপ ও ন্যায্যমূল্যের অভাবে প্রান্তিক কৃষকরা সংকটে রয়েছেন। এ পরিস্থিতিতে জলবায়ু-সহনশীল প্রযুক্তি, আধুনিক সংরক্ষণাগার ও কৃষকবান্ধব বাজার ব্যবস্থা গড়ে তোলার আহ্বান জানান তিনি।
সংসদ সদস্য নূরুন্নিসা সিদ্দিকা বলেন, নারী ও শিশুর নিরাপত্তাহীনতা উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। বাজেটে এ বিষয়ে সুস্পষ্ট পরিকল্পনা থাকা প্রয়োজন। পাশাপাশি খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কৃষকের সুরক্ষা ও বাজারে চাঁদাবাজি বন্ধের ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
ড. খ ম কবিরুল ইসলাম বলেন, আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে অনেক উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন বাধাগ্রস্ত হয়। তিনি ইবতেদায়ি মাদরাসা শিক্ষকদের কম বেতনের প্রসঙ্গ তুলে ধরে শিক্ষা ব্যবস্থার বৈষম্য দূর করার আহ্বান জানান।
ড. মো. ফরিদুল ইসলাম বলেন, কৃষি দেশের অস্তিত্বের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পৃক্ত। তাই কৃষিসংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর মধ্যে আরও সমন্বয় প্রয়োজন।
ডা. মোহাম্মদ রুহুল আমিন বলেন, স্বাস্থ্যসেবা ধীরে ধীরে পণ্যনির্ভর হয়ে উঠছে। ফলে সাধারণ মানুষের চিকিৎসা পাওয়া কঠিন হয়ে যাচ্ছে। দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থার উন্নয়ন হলে বিদেশে চিকিৎসা বাবদ বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয়ও কমানো সম্ভব হবে।
মাসুমুর রহমান খলিলী বলেন, বাজেটের বিভিন্ন ভর্তুকি প্রকৃত উপকারভোগীদের কাছে পৌঁছায় না। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে খাদ্য নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে পড়ছে। তাই গবেষণার মাধ্যমে আগাম ফসল উৎপাদনে সক্ষম জাত উদ্ভাবনের ওপর গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
সভাপতির বক্তব্যে ড. মোজাম্মেল হক বলেন, শিক্ষা ও গবেষণার সঙ্গে বাস্তব চাহিদার সংযোগ এখনও দুর্বল। গবেষণালব্ধ জ্ঞানকে বাস্তব প্রয়োগে রূপ দিতে উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি করতে হবে। একইসঙ্গে কৃষিজমি সংরক্ষণ, ব্লু ইকোনমি ও বায়ো ইকোনমিতে বিনিয়োগ এবং স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে পর্যাপ্ত বাজেট বরাদ্দের ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।