সঠিক সমাজ গঠনের জন্য আইন ও প্রথার মধ্যে ভারসাম্য থাকা জরুরি— এডভোকেট গাজী ফয়সাল ইসলাম
ছবি— এডভোকেট গাজী ফয়সাল ইসলাম
সমাজ পরিচালনার ক্ষেত্রে আইন ও প্রথা—এই দুইটি উপাদান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। আমরা দৈনন্দিন জীবনে প্রায়ই এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হই, যেখানে মানুষ যুক্তির চেয়ে দীর্ঘদিনের অভ্যাস বা প্রচলিত রীতিকে বেশি গুরুত্ব দেয়।
অনেকেই বলেন, “এটা তো আমরা সবসময় করে আসছি” কিংবা “এটাই তো আমাদের সমাজের নিয়ম”। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে—শুধু প্রচলিত থাকার কারণে কোনো বিষয় গ্রহণযোগ্য হতে পারে কি? নাকি আইনের অবস্থানই সর্বোচ্চ?
আইন (Law) হলো রাষ্ট্র কর্তৃক প্রণীত ও স্বীকৃত বিধান, যা সমাজে শৃঙ্খলা বজায় রাখতে প্রণয়ন করা হয়। আইন ভঙ্গ করলে শাস্তির বিধান থাকে এবং তা আদালত, প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মাধ্যমে বাস্তবায়িত হয়। অন্যদিকে প্রথা (Custom) হলো সমাজের দীর্ঘদিনের অভ্যাস, সংস্কৃতি ও আচরণগত রীতি, যা মানুষের মধ্যে সামাজিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়।
বাস্তবতায় দেখা যায়, অনেক ক্ষেত্রে আইনের পাশাপাশি প্রথাও গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলে। বিশেষত বিচারিক কার্যক্রমে কিছু ক্ষেত্রে দীর্ঘদিনের চর্চা বা প্রচলিত বাস্তবতা সিদ্ধান্ত গ্রহণে প্রভাব বিস্তার করে। তবে সেই প্রভাব সবসময় আইনকে অতিক্রম করে না; বরং আইন ও বাস্তবতার সমন্বয় হিসেবেই বিবেচিত হয়।
আইন পেশায় কাজ করতে গিয়ে প্রায়ই এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়, যেখানে মানুষের প্রত্যাশা ও আইনের ব্যাখ্যার মধ্যে পার্থক্য দেখা যায়। কোনো ব্যক্তি মৌখিক চুক্তি বা পারস্পরিক বিশ্বাসের ভিত্তিতে একটি বিষয়ে যুক্ত হন, কিন্তু পরবর্তীতে বিরোধ সৃষ্টি হলে আইনের আশ্রয় নেন। তখন আদালতকে শুধু ঘটনার সামাজিক দিক নয়, আইনি কাঠামোও বিবেচনায় নিতে হয়।
আবার কিছু ক্ষেত্রে দেখা যায়, মানুষ সচেতনভাবে ঝুঁকি গ্রহণ করলেও পরবর্তী সময়ে দায়বদ্ধতার প্রশ্ন একতরফাভাবে নির্ধারণের চেষ্টা করা হয়। ফলে আইনের প্রয়োগ, বিচারিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং সামাজিক বাস্তবতা—এই তিনটির মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে দাঁড়ায়।
আইন ও প্রথার মধ্যে পার্থক্যও স্পষ্ট। আইন লিখিত, রাষ্ট্রীয় এবং বাধ্যতামূলক; অন্যদিকে প্রথা অলিখিত, সামাজিক এবং সময়ের সঙ্গে গড়ে ওঠা আচরণগত কাঠামো। আইন পরিবর্তন করা সম্ভব সংসদীয় প্রক্রিয়ার মাধ্যমে, কিন্তু প্রথা পরিবর্তন সাধারণত ধীরগতিতে ঘটে।
বাংলাদেশের সমাজব্যবস্থায় এর উদাহরণও রয়েছে। বাল্যবিবাহ আইনত নিষিদ্ধ হলেও কিছু এলাকায় সামাজিক প্রথা হিসেবে তা এখনো বিদ্যমান। নারীর উত্তরাধিকার অধিকার আইন দ্বারা স্বীকৃত হলেও অনেক পরিবারে মেয়েদের সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত করা হয়। অর্থাৎ আইন একদিকে অধিকার নিশ্চিত করছে, অন্যদিকে কিছু প্রচলিত প্রথা সেই বাস্তবায়নে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে।
তবে এটাও সত্য যে, সমাজ পরিচালনায় সব প্রথা নেতিবাচক নয়। অনেক ইতিবাচক সামাজিক মূল্যবোধও প্রথার মাধ্যমে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে ছড়িয়ে পড়ে। তাই প্রথাকে পুরোপুরি অস্বীকার নয়, বরং আইনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা জরুরি।
রাষ্ট্রীয় কাঠামোয় আইনের অবস্থান সর্বোচ্চ। কিন্তু মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাপন, পারিবারিক সিদ্ধান্ত ও সামাজিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে প্রথার প্রভাবও অনস্বীকার্য। তাই একটি ন্যায়ভিত্তিক ও মানবিক সমাজ গঠনের জন্য আইন ও প্রথার মধ্যে সংঘাত নয়, বরং ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা প্রয়োজন।
লেখক:
এডভোকেট গাজী ফয়সাল ইসলাম
বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট (হাইকোর্ট বিভাগ)















