প্রফেসর রাজ্জাক : আত্মমর্যাদায় বলীয়ান অনন্য এক জ্ঞানতাপস
প্রফেসর আব্দুর রাজ্জাক।
আহমদ ছফার যদ্যপি আমার গুরু বইটি পড়েই প্রফেসর আব্দুর রাজ্জাকের প্রতি আমার ভালো লাগার শুরু। প্রফেসর রাজ্জাক ১৯৩৬ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনৈতিক অর্থনীতি বিভাগে প্রভাষক হিসেবে যোগ দেন। পরবর্তীতে এ বিভাগ থেকে অর্থনীতি ও রাষ্ট্রবিজ্ঞান নামে দুটি পৃথক বিভাগ প্রতিষ্ঠিত হলে তিনি রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে যোগ দেন। পদোন্নতির জন্য কখনো আবেদন করতেন না বলে দীর্ঘদিন জ্যেষ্ঠ প্রভাষক হিসেবেই কর্মরত ছিলেন। ১৯৭৫ সালে বাংলাদেশ সরকার তাঁকে জাতীয় অধ্যাপক হিসেবে নিয়োগ দিলে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অবসর গ্রহণ করেন।
ব্যক্তিগতভাবে প্রফেসর রাজ্জাককে আমার ভালো লাগার সবচেয়ে বড় কারণ তাঁর আপসহীন ব্যক্তিত্ব ও আত্মমর্যাদাবোধ। তিনি ছিলেন ভীষণ জেদি এবং আত্মমর্যাদায় ছিলেন ‘চির উন্নত শির’। তাঁর এমনই আত্মসম্মানবোধ ছিল যে, লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিকসে অধ্যাপক হ্যারল্ড লাস্কির অধীনে পিএইচডি করার জন্য লন্ডনে গেলেও লাস্কির মৃত্যুর পর থিসিস মূল্যায়নের জন্য উপযুক্ত কাউকে খুঁজে পাননি বলে তিনি থিসিস জমা না দিয়েই দেশে ফিরে আসেন। অর্থাৎ কোনো ডিগ্রি ছাড়াই তিনি দেশে প্রত্যাবর্তন করেছিলেন।
প্রিয় লেখক হুমায়ূন আহমেদ প্রফেসর রাজ্জাক সম্পর্কে লিখেছিলেন, “ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মধ্যে প্রফেসর আব্দুর রাজ্জাক সম্ভবত সবচেয়ে রহস্যময় মানুষ ছিলেন। বিয়ে করেননি, চিরকুমার মানুষ। সবসময় পায়জামা ও গেরুয়া রঙের পাঞ্জাবি পরতেন। খুব কম কথা বলতেন, তবে অতি ঘনিষ্ঠদের কাছে মজলিশি মানুষ হিসেবে পরিচিত ছিলেন। তাঁর চেহারার সঙ্গে হো চি মিনের চেহারার সাদৃশ্য ছিল। তিনি নিয়ম করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্লাবে যেতেন। নির্দিষ্ট একটি জায়গায় বসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাবা খেলতেন। অস্থিরতা নামক বিষয়টি তাঁর মধ্যে কখনো দেখিনি, তবে দাবা খেলার শেষের দিকে—যখন জয়-পরাজয় নির্ধারিত হতো—তখন কিছুটা অস্থিরতা দেখা যেত।”
হুমায়ূন আহমেদ আরও লিখেছেন, “বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষমতাধর মানুষদের একজন ছিলেন তিনি। তাঁর ক্ষমতার উৎস আমি জানতাম না। শুনেছি, তিনি হ্যারল্ড লাস্কি নামক জগৎবিখ্যাত অধ্যাপকের সঙ্গে পিএইচডি করছিলেন। থিসিস লেখার শেষ পর্যায়ে লাস্কি মারা যান। প্রফেসর রাজ্জাক থিসিস জমা না দিয়েই দেশে ফিরে আসেন। কারণ তাঁর ধারণা হয়েছিল, হ্যারল্ড লাস্কি ছাড়া এই থিসিসের মর্ম কেউ বুঝবে না।”
অধ্যাপক রাজ্জাককে নিয়ে আগ্রহ ও শ্রদ্ধা শুধু দেশেই সীমাবদ্ধ ছিল না; বিদেশেও তাঁর খ্যাতি ছড়িয়ে ছিল। দেশের বাইরের অনেক গবেষক তাঁর পরামর্শে পিএইচডি সম্পন্ন করেছেন। অসংখ্য গবেষণাপত্র তাঁকে উৎসর্গ করা হয়েছে। হুমায়ূন আহমেদ তাঁর স্মৃতিচারণে উল্লেখ করেন, এক বাঙালি অর্থনীতিবিদ ঢাকায় এলেই রাজ্জাক স্যারের বাসায় যেতেন। তিনি কয়েকবার তাঁকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্লাবেও নিয়ে এসেছেন এবং পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন এই বলে—“এই ছেলে Economics ভালো জানে।”
সেই অর্থনীতিবিদের নাম ছিল অমর্ত্য সেন। পরবর্তীকালে তিনি অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন।
প্রফেসর রাজ্জাক ছিলেন এমন একজন জ্ঞানতাপস, যিনি প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রির চেয়ে জ্ঞানের মর্যাদাকে বড় করে দেখতেন। তাঁর জীবন ছিল আত্মমর্যাদা, বুদ্ধিবৃত্তিক সততা এবং ব্যক্তিত্বের এক অনন্য উদাহরণ।
আজকের সময়ে প্রফেসর রাজ্জাকের মতো ব্যক্তিত্বসম্পন্ন জ্ঞানী ও বুদ্ধিজীবীর বড়ই অভাব অনুভূত হয়। চারদিকে তোষামোদকারী ও সুবিধাবাদীদের ভিড়ে প্রকৃত দেশপ্রেমিক, স্বাধীনচেতা ও আত্মমর্যাদাসম্পন্ন বুদ্ধিজীবীদের খুঁজে পাওয়া ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে। তাই প্রফেসর রাজ্জাকের জীবন ও আদর্শ আমাদের জন্য আজও প্রাসঙ্গিক এবং অনুকরণীয়।
লেখক : কবি, সাংবাদিক ও সংগঠক, সভাপতি-চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতি (চবিসাস)।










